মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের বিভিন্ন থানার মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি নিয়ে পদ বানিজ্যের অভিযোগ!

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগ। ২৫শে এপ্রিল ২০১৮ সালে সর্বশেষ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘদিনের যাচাই-বাছাই শেষে ৩১শে জুলাই ২০১৮ মঙ্গলবার রাতে আওয়ামীলীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে কমিটি ঘোষণা করেছেন দলের সাধারণ সম্পাদক জনাব ওবায়দুল কাদের সাহেব। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সেই কমিটিতে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন মেহেদী হাসান এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন যুবায়ের আহমেদ। মেহেদী হাসান ও যুবায়ের আহমেদ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার দীর্ঘ ১ বছর পর ২৮ জুন ২০১৯ তারিখে সদ্য বহিষ্কৃত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাবেক সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানি স্বাক্ষরিত ঐ তালিকায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়।

তারা দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার এক বছর চার মাস পূর্ণ হলেও এখন পর্যন্ত তারা ঢাকা মহানগর দক্ষিনের বিভিন্ন থানার মেয়াদ উত্তীর্ণ ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করতে পারে নাই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন কর্মী বলেন, সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক টাকা ছাড়া কোন কমিটি ঘোষণা দেন না এবং তাদের মূল হাতিয়ার হল তারা কমিটি আটকে রেখে একাধিক প্রার্থীর কাছ থেকে টাকা আদায় করে থাকেন। যে প্রার্থী টাকা বেশি দিবে তাকেই কমিটি দেয়া হবে। অনেক সময় বিপুল অঙ্কের টাকা দেয়ার পরও কমিটি আটকে রাখা হয় বিভিন্ন মহলের চাপে।

এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর দক্ষিন ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা চালানো হয়। ১০ নভেম্বর রবিবার রাত ১০ টার দিকে ফোনে তার কাছে কমিটি ঘোষণার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন,

‘আমরা কমিটি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি, ইনশাআল্লাহ্‌ এই মাসের মধ্যেই ঢাকা মহানগর দক্ষিণের মেয়াদ উত্তীর্ণ সবগুলো থানা কমিটি ঘোষণা করা হবে।’

সাম্প্রতিক সময়ের ক্যাসিনো কাণ্ড এবং বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের অঙ্গসংগঠনের শুদ্ধি অভিযানের কথা উল্লেখপূর্বক তার কাছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে পদ এবং কমিটি বাণিজ্যের গুঞ্জনের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান,

‘এসব অভিযোগ উত্তরেও আছে, সেন্ট্রালেও আছে, সেই প্রথম লগ্ন থেকে লেখক ভাইয়ের কমিটি থেকে শুরু করে কমিটি বাণিজ্য বা গিফট দিচ্ছে, এই বড় নেতার ভাই, ছাত্রলীগের ভাই ফোন দিছে, এসব থাকবেই। আমার নলেজে এখন পর্যন্ত কোন কমিটি লেনদেনের মাধ্যমে হয়নি।’

যেহেতু আপনার ভাষ্য মতে, কমিটি কোনরকম আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে হয়নি এবং এটা শুধুই একটা গুঞ্জন তাহলে কমিটি ঘোষণায় এত বিলম্বের কারন জানতে চাইলে তিনি বলেন-

‘হ্যা, গুঞ্জনতো থাকবেই, কমিটি আমরা দিয়ে দিবো, কমিটিটা দেই, তারপর দেখেন, শুনেন কি হয়?’

অতঃপর আমরা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক যুবায়ের আহমেদের সাথে যোগাযোগ করি এবং দক্ষিণের বিভিন্ন থানার কমিটি ঘোষণার ব্যাপারে তার মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন- ‘আমরা ইতিমধ্যে ২টা কমিটি ঘোষণা করেছি এবং বিগত দিনগুলি কেমন চলেছে, ভালো-খারাপ তা আমি জাস্টিফাইড করতে পারি না, আমি আমার সংগঠনটা চেষ্টা করি, যেহেতু নেত্রী আমাকে দায়িত্ব দিছে ভালো কিছু করার জন্য। তাছাড়া প্রত্যেক ক্রিয়ার একটা প্রতিক্রিয়া আছে। আসলে এই সংগঠনটা আমার না, এই সংগঠন জননেত্রি শেখ হাসিনার, বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে এই সংগঠন তৈরি করছে। আমি সবসময় এটা মনে করি, এই সংগঠনকে আমার কিছু দেয়ার আছে, নেয়ার নাই। আমরা প্রতিনিয়তই চাই কমিটি করার, কিন্তু অনেক ধরনের প্রবলেম ক্রিয়েট হয়, কেউই চায় না কমিটিগুলো আটকে থাকুক, তাছাড়া কমিটি আটকে রেখে আমার কোন লাভ আছে বলে মনে হয় না। কিছু লোকাল প্রবলেম থাকে, সাংগঠনিক জটিলতা থাকে, নেতাদের সাথে আলোচনার কিছু বিষয় থাকে, এসব কারনেই কমিটি ঘোষণায় অনেক জটিলতা তৈরি হয়। তারপরও আমরা একটা সিদ্ধান্তে এসে উপনীত হয়েছি। আশা করি খুব শীঘ্রই আমরা ঘোষণা করবো।’

এছাড়াও তিনি ছাত্রলীগের বেশ কিছু ইউনিটের সাথে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ছাত্রলীগের অগ্রগতির তুলনামুলক বক্তব্য পেশ করেন এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটিগুলো সভানেত্রীর টাইমলাইন অনুযায়ী ডিসেম্বরের ১০ তারিখের মধ্যেই ঘোষণা হবে বলে জোরালো অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে কমিটি কিংবা পদ বাণিজ্য গুঞ্জনের অভিযোগ সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, ‘দেখেন আমার ব্যাপারে যদি কোন অভিযোগ থাকে তাহলে বলতে পারেন। সভাপতি, সে করছে কিনা তা আমি জানি না, আমার মনে হয় না করার কথা, যদি করে থাকে তাহলে সেটা একান্তই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। সে করলে অবশ্যই একা বা পারসোনালি করেছে, আমি যদি করে থাকি আমারটা তো অন্য কেউ জানবে না এবং অন্য কারোটা আমি জানবো না। আমার কথা হল যদি এরকম কোন অভিযোগ থাকে, আমার বিরুদ্ধে থাকে কিংবা কারো বিরুদ্ধে থাকে তাহলে আপনারা সেভাবে লেখেন। তবে আমার একটা রিকোয়েস্ট থাকবে, যদি এরকম কোন পদ বানিজ্যের সাথে কেউ জড়িত থাকে, সে আমি হই বা আমার সভাপতি(ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগ) যেই হোক না কেন আপনাদের কলম যাতে থেমে না থাকে। কিন্তু যে জড়িত তার বিরুদ্ধেই যেন লেখা হয়। আর যে জড়িত না, যে কিনা প্রতিনিয়ত পরিশ্রম করে সফলতার এই পর্যায়ে এসেছে, তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারটা আপনাদের ভুল লেখনির দ্বারা ধ্বংস করবেন না।’’

দীর্ঘ ১ বছর ৪ মাস ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের দায়িত্ব পাওয়ার পরও হাতে গোনা কয়েকটা কমিটি ঘোষণা ছাড়া তাদের কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের অন্তর্গত বেশ কিছু থানার কমিটি নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছেই না, কে বা কারা এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছেন এবং সভাপতি-সেক্রেটারি কেনই বা কমিটি ঘোষণা করতে এই অবদি অপারগতা প্রকাশ করে আসছিলেন। আর এই অপারগতার কারনেই বিভিন্ন মহলে তাদের বিরুদ্ধে পদ বানিজ্যের অভিযোগ গুঞ্জনে পরিণত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

আমরা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করি এবং তাদের উভয়ের বক্তব্য শুনি। তারা উভয়েই তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আশা করি খুব শীঘ্রই আমাদের অনুসন্ধানী টিম তাদের বিরুদ্ধে আনীত পদ/কমিটি বানিজ্যের সকল ধোঁয়াশা জনসম্মুখে খোলসা করবে।

তাদের সাথে যোগাযোগের পর এবং এই সংবাদ প্রকাশের আগে হঠাৎ করেই রাত ১২ টার পর সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বেশ কয়েকটি থানার[ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, ওয়ারী এবং খিলগাঁও মডেল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা] ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়।